পূর্ব যুগের মুসলমানরা কেমন ছিলেন? | When Queen Talks | Best Life stories ever
You cannot copy any content of this page! For Permission: Ferdous Ara. Thank You!

পূর্ব যুগের মুসলমানরা কেমন ছিলেন?

আল্লাহ্। যিনি এই বিশ্বের প্রতিপালক। যিনি মানব জাতির সৃষ্টি কর্তা। সেই মহান আল্লাহ তা’য়ালার উপর যারা ঈমান এনেছে, তাঁরাই হলো মুসলমান। জাতি হিসেবে মুসলমান জাতিই হলো পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ জাতি। কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীতে কিছু নামধারী মুসলমান আছে যারা ইসলাম ধর্মের বিধান কে সম্পূর্ণরূপে অমান্য করে বিধর্মীয় সমস্ত আচার-আচরণকে গ্রহণ করে মুসলমান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্য্য কে ম্লান করে দিয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

বর্তমানে যারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করছে তারা শুধুমাত্র নামে মুসলমান। কিন্তু ঈমানের দিক দিয়ে তারা প্রকৃত মুসলমানের ধারে কাছেও নেই। প্রকৃত ভাবে মুসলমানরা কেমন হওয়া উচিৎ তা’ পূর্ব যুগের মুসলমানদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখলেই জানা যায়। পূর্ব যুগের মুসলমানরা কেমন ছিলেন, নিম্নের এই ঘটনা থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়। এমন মুসলমান কি বর্তমানে এই পৃথিবীতে আছে?

হযরত ওমর (রাঃ) এর শাসন আমলের একটি ঘটনাঃ-

ঘটনাটি ন্যায় পরায়ণ খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর সময় কার ঘটনা। একদা দুই ব্যক্তি এক যুবককে জোর করে ধরে নিয়ে আসলেন খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর দরবারে। তাঁরা খলিফা ওমর (রাঃ) এর কাছে ধরে আনা লোকটির বিচার চাইলো। বললো যে, এই যুবকটি আমাদের পিতা কে হত্যা করেছে। আমরা এর ন্যায় বিচার কামনা করছি।

তখন ন্যায়ের প্রতীক হযরত ওমর (রাঃ) ওই যুবকের কাছে জানতে চাইলেন, তাঁরা যে দাবি করছে তা কতটুকু সত্য ? তখন লোকটি বললো, তাঁরা যা বলছে, সত্যিই বলছে। আমি ভীষণ ক্লান্ত অবস্থায় একটি গাছের ছায়ায় বিশ্রামের জন্য বসেছিলাম। কখন যে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম, বলতে পারি না।

ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার একমাত্র বাহন উটটি🐫 আমার পাশে নেই। সেই উঠকে আমি চারিদিকে খুঁজতে লাগলাম। কিছুদুর যাওয়ার পর দেখলাম, আমার উটটি মৃত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। মৃত উটটির পাশে এই দুই যুবকের বাবা উপস্থিত ছিলেন। আমার উট তাদের বাগানে প্রবেশ করেছিল বলে তারা পাথর মেরে আমার উটটি কে হত্যা করেছে।

একথা শুনে আমি রাগান্বিত হয়ে উঠলাম। তাদের বাবার সাথে তর্কাতর্কি শুরু হয়ে গেল এবং এক পর্যায়ে তার বাবার মাথায় পাথর দিয়ে যখন আঘাত করে ফেলি তখন সেখানেই তাদের বাবা মারা যান। এ হত্যাকাণ্ডটি সম্পূর্ণ আমার অনিচ্ছাকৃত ভাবে হয়েছে। যার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

তখন বাদীরা আরজ করলো, আমরা আমাদের বাবার মৃত্যুর অপরাধে তার মৃত্যুদণ্ড চাই। সব ঘটনা শোনার পর হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, উটের বিনিময়ে একটি উট নিলেই তো হয়ে যেত কিন্তু তুমি বৃদ্ধকে হত্যা করেছো। হত্যার বদলে হত্যা। সুতরাং তোমাকেও এখন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।

তোমার যদি কোন শেষ ইচ্ছা থেকে থাকে বলতে পারো। তখন সেই অপরাধী ব্যক্তিটি বললো, আমার কাছে কিছু ঋণ ও অন্যের কিছু আমানত সংরক্ষিত আছে। আপনি যদি আমাকে কিছুদিন সময় দিতেন, তবে আমি আমার বাড়িতে গিয়ে সেই আমানত গুলো ফিরিয়ে দিতাম ও ঋণ শোধ করে আসতাম।

তখন হযরত খলিফা ওমর (রাঃ) বললেন, তোমাকে তো একা ছেড়ে দিতে পারি না‌। যদি তোমার পক্ষ থেকে কেউ তোমার জিম্মাদার হতে রাজি হয়, তবে তাকে রেখে তুমি সাময়িক ভাবে মুক্তি পেতে পারি। নিরাশ হয়ে সেই ব্যক্তিটি বললো, এখানে তো আমার কেউ নেই যে আমার জিম্মাদার হবে।

এই কথা শুনে হঠাৎ মজলিসে এসে উপস্থিত হলেন আল্লাহর নবীর এক সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) । তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, আমি হবো এই লোকটির জামিনদার। সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) এর এমন উত্তরে সবাই হতবাক হয়ে গেল। একটি অপরিচিত ব্যক্তি, যে কিনা আবার মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি। তার জন্য তিনি কিভাবে জামিনদার হতে পারেন ?

যাহোক, খলিফা ওমর (রাঃ) বললেন, ঠিক আছে, আগামী শুক্রবার জুম্মা পর্যন্ত এই মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীকে মুক্তি দেওয়া হলো। জুম্মার আগে যদি এই ব্যক্তিটি মদিনায় ফিরে না আসে তাহলে এই ব্যক্তির পরিবর্তে আবু জর গেফারী (রাঃ) কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। মুক্তি পেয়ে সে আসামি কত দুর মাইলে অবস্থিত তাঁর বাড়ির দিকে ছুটে চললো। আর আবু জর গেফারী তাঁর বাড়িতে ফিরে গেলেন।

দেখতে দেখতে পরের জুম্মাবার এসে গেছে। এদিকে সেই আসামি যুবকের কোনো খোঁজখবর নেই। হযরত ওমর (রাঃ) রাষ্ট্রীয় পত্র বাহককে আবুজর গিফারী (রাঃ) এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। পত্রে লিখা ছিল, আজ শুক্রবার জুম্মা সেই আসামি ব্যক্তিটি যদি না আসে তবে আবুজর গিফারী (রাঃ) এর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। আবুজর গিফারী যেন সময়মতো জুম্মার প্রস্তুতি নিয়েই মসজিদে নববীতে এসে হাজির হয়।

খবর শুনে সারা মদিনায় থমথমে অবস্থা। একজন নিষ্পাপ সাহাবী আবু যর গিফারী আজ বিনা দোষে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবে। জুম্মার পর মদিনার সবাই মসজিদের সামনে সমবেত হলো। সবার চোখে পানি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য জল্লাদ প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জীবনে কত জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সে, তার হিসেব নেই। কিন্তু আজ চোখের জলে তিনিও ভাসছেন। কোনোভাবেই চোখের পানি আটকাতে পারছেন না।

আবু জর গিফারী (রাঃ) এর মত একজন সাহাবী সম্পূর্ণ বিনা দোষে আজ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এটা মদিনার কেউই মেনে নিতে পারছেন না। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ প্রদানকারী খলিফা ওমর (রাঃ) ও সমানে কেঁদে যাচ্ছেন। কিন্তু আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। আইন পরিবর্তন-এ কারো কোনো হাত নেই। আবুজর গিফারী (রাঃ) মধ্যে কোন চিন্তা দেখা যাচ্ছে না। তিনি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন।

জল্লাদ ধীর পায়ে আবুজর গিফারীর দিকে কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে আসতে থাকলেন। জল্লাদের পা কোনভাবেই আগাতে চাইছে না। মনে হয় যেন পায়ে কেউ পাথর বেঁধে দিয়েছে। এমন সময় এক সাহাবী জল্লাদকে বললো, এ জল্লাদ একটু থামো। ওই দিকে তাকিয়ে দেখো মরুভূমিতে ধুলার ঝড় উঠিয়ে কেউ মনে হয় যেন এ দিকেই এগিয়ে আসছে।

হতে পারে ওই আসামি ব্যক্তিটির ঘোড়ার ধুলি। একটু দেখে নাও। তারপর না হয় আবু জর গেফারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করিও। ঘোড়াটি কাছে আসলে দেখা গেল যে, সত্যিই ওই আসামির ঘোড়া। সেই যুবকটি দ্রুত খলিফার সামনে এসে বললো, হুজুর বেয়াদবি মাফ করবেন। রাস্তায় যদি ঘোড়া পায়ে ব্যথা না পেত, তবে সঠিক সময়ে আসতে পারতাম।

বাড়িতে আমি একটুও দেরি করিনি। বাড়ি পৌঁছে গচ্ছিত আমানত ও ঋণ পরিশোধ করে ফেলি। তারপর বাড়ি এসে বাবা-মা এবং নববধূর কাছে সব খুলে বলে চিরবিদায় নিয়ে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। এখন আবুজর গিফারী (রাঃ) ভাইকে মুক্তি দিয়ে দেন। আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে পবিত্র করুন।

“কেয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে খুনি হিসেবে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চায় না”। আশেপাশের সব নীরব থমথমে অবস্থা। সবাই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন যুবক আসামি তার নিশ্চিত মৃত্যুর কথা জেনেও ফিরে আসাতে সবাই খুব অবাক হয়ে গেল।

খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) যুবকটি কে বললেন, তুমি জানো যে, তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। তার পরেও তুমি কেন ফিরে এলে ? তখন সেই যুবক উত্তর দিলো, আমি ফিরে এসেছি কারণ কেউ যেন কোন দিন বলতে না পারে, এক মুসলমানের বিপদে আরেক মুসলমান সাহায্য করতে এগিয়ে এসে নিজেই বিপদে পড়ে গেছে।

এবার হযরত ওমর (রাঃ) আবুজর গিফারী (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কেন একজন অচেনা মানুষের জামিনদার হলেন? তিনি তো ফিরে নাও আসতে পারতেন। তখন উত্তরে হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) বললেন, পরবর্তীতে কেউ যেন বলতে না পারে, এক মুসলমান বিপদে পড়েছিল অথচ কেউ তাকে সাহায্য করতে আসেনি।

এমন কথা শুনে বাদী ( মৃত ব্যক্তিটির সন্তান দ্বয়ের ) দুই জনের মধ্যে একজন বলে উঠলেন, হে খলিফা আপনি তাকে মুক্ত করে দিন। আমরা তার উপর করা দাবি তুলে নিলাম। তখন হযরত ওমর (রাঃ) তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন ? তাদের মাঝে একজন বলে উঠলেন, পরবর্তীতে কেউ যেন বলতে না পারে, এক মুসলমান অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল করে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে। ক্ষমা চেয়েছে, তারপরেও তাকে ক্ষমা করা হয়নি।

পরিশেষেঃ- উপরের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই বোঝা যায় যে, পূর্ব যুগের মুসলমানরাই ছিলেন প্রকৃত মুসলমান। যাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন অমিল ছিল না। এক মুসলমান অন্য এক মুসলমানের জন্য জান দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। ইসলাম ধর্ম মুসলমানকে এমনই শিক্ষা দিয়েছে। এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। এই ঘটনা থেকে বর্তমান মুসলমানদের শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে উত্তম কর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত করা উচিৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *